যে ৭টি কারণে Extra Curricular Activities-এ যুক্ত হতে পারো

ছবি কৃতজ্ঞতা- 10 Minute School Blog

বিতর্ক, সায়েন্স ফেস্টিভ্যাল, মডেল ইউনাইটেড নেশনস, গান, কবিতা আবৃত্তি, নাচ, কেইস কম্পিটিশন, লেখালেখি, ম্যাথ, ফিজিক্স বা ইনফরমেটিক্স অলম্পিয়াড, সমাজসেবামূলক স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান – নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পড়াশুনার পাশাপাশি করার মতন কাজের অভাব নেই আজকের পৃথিবীতে। তাই “পড়াশুনার পাশাপাশি অন্য কোন কাজ করা”- এটি শুনে নাক সিঁটকানোর দিন ফুরিয়ে গেছে। অভিভাবক হোন বা শিক্ষার্থী, আজকের যুগে সবাই কম-বেশি জানেন, Extra Curricular Activities বা সহশিক্ষা কার্যক্রমের দরকার কতটুকু। যারা জানেন, কিংবা যারা জানেন না, সবার জন্যই এই লেখা। আজকে আমরা ৭টি পয়েন্টে জেনে নিবো জীবনে কী কী উপায়ে Extra Curricular Activities কাজে লাগতে পারে।

১) পাবলিক ইন্টার-এ্যাকশান ও বন্ধুত্ব:

আমরা অনেকেই আছি, যারা ছোটবেলা থেকে বেশি মানুষের সাথে কথা বলে অভ্যস্ত নই। এখনকার দিনে বিল্ডিংগুলোতে প্রতিবেশিদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। একক পরিবারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় যৌথ পরিবারের মতন নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের সাথেও দেখা-সাক্ষাৎ হয় কম। সাথে বেড়েছে মানুষের সীমাহীন ব্যস্ততা। এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও কথা-বার্তা অনেক কমে গেছে।

পাড়ার খেলার মাঠেও যাতায়াতের সুযোগ কমে গেছে বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরই। কাজেই মানুষে মানুষে যোগাযোগের মাত্রা এখন অনেক কম। এইরকম পরিবেশ একজন কিশোর বা কিশোরীকে ইন্ট্রোভার্ট বা অন্তর্মুখী করে তোলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। এমন একটা সময়ে যে কোন এক্সট্রা-কারিকুলার এক্টিভিটি হতে পারে মানুষের সাথে ইন্টারেকশন বা মিথষ্ক্রিয়ার একটা চমৎকার ক্ষেত্র।

বিতর্ক, গান, বিজনেস কম্পিটিশন বা অন্য যে কোন সংগঠন করতে গিয়ে প্রতিযোগী, আয়োজক, শিক্ষকসহ অনেকের সাথেই নিয়মিত কথা হয়। অনেকের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে, যা অনেকদিনের মূল্যবান সম্পদ হতে পারে যে কারও জীবনে।

২) নেটওয়ার্কিং:

“আমার তো বড় পদওয়ালা মামা-চাচা নেই, চাকরি হবে কীভাবে”- এই ধরণের অভিযোগের দিন কিন্তু অনেকটাই শেষ। বহু কোম্পানি এখন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিয়োগ করতে চায়। কিন্তু তারা পরিচিত বা জানাশোনা কাউকে খুঁজে সবার আগে।

ধরো, তুমি কোন কোম্পানির মালিক হলে। তোমার কোম্পানিতে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সময় যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি পরিচিত, বিশ্বস্ত বা পছন্দের কাউকেই কি নিয়োগ দিতে না? এখনকার নিয়োগদাতারাও এমনটাই খুঁজে থাকেন। কাজেই নিজেকে উপযুক্ত মানুষের কাছে চেনানো অনেক জরুরি।

তোমার গুণাবলীর প্রকাশ এক সময় তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে বা কোন সংগঠন করলে নবীন-প্রবীণ বহু মানুষের সাথে দেখা হয়, কথা হয়- যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।

কোন একদিন তোমার কোন গুণের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে যেতে পারেন বড় কোন কোম্পানির বর্তমান বা ভবিষ্যতের সিইও। হয়তো তাঁর সেই কোম্পানি পরিচয়ের খাতিরেই তোমাকে ডেকে নিতে পারে নিজের প্রতিষ্ঠানে।

অথবা কোন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ায় প্রতিযোগিতার আয়োজক/স্পন্সর কোম্পানি তোমাকে নিয়োগ দিয়ে দিতে পারে নিজেদের কোন ভালো পদে! বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়েও হরেক রকম কাজ জানা মানুষের সাথে পরিচিতি হতে পারে তোমার। এরকম উদাহরণ কিন্তু এখন কম নেই।

৩) জ্ঞানচর্চা ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ:

বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণ সব আয়োজনের ভিড়ে থেকে আনন্দঘন মুহূর্তের আতিশয্যে অনেকেই এই অংশটার কথা ভুলে যায়। যে কোন সহশিক্ষা কার্যক্রম তোমাকে বাড়তি কিছু জানার সুযোগ করে দেয়। সেটাকে তাই যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।

গান করতে গিয়ে শুধু খ্যাতির পিছনে ছুটলে হবে না, সংগীতশাস্ত্রের জ্ঞান আহরণের জন্য লেগে পড়তে হবে। বিতর্ক করতে গেলে বিশ্বের তাবৎ ঘটনার বিশ্লেষণ জানার পিপাসা জাগিয়ে রাখতে হবে। ছবি তোলার শখ থাকলে ফটোগ্রাফির আদ্যোপান্ত জানার জন্য নেট সার্ফিং, এক্সিবিশন দেখা আর বড়দের কাছ থেকে শেখার তাগিদ থাকতে হবে।

সমাজসেবাভিত্তিক কোন সংগঠনে কাজ করতে করতে সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অফিসিয়াল কাগজপত্র লেখালেখি, টিম ম্যানেজমেন্ট আর কমিউনিকেশন স্কিলবাড়িয়ে নিতে হবে।

ভবিষ্যতে যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা, লেখালেখির গুণ বা যোগাযোগ দক্ষতা হয়ে যাবে তোমার সহজাত ব্যাপার, যা অন্য অনেককেই রীতিমতো সংগ্রাম করে শিখতে হবে!

৪) বড় স্বপ্ন দেখার সিঁড়ি:

এই ব্যাপারটা ধ্রুব সত্য নয় যে, সহশিক্ষা কার্যক্রম করলেই তুমি বিশাল স্বপ্ন সফল করে ফেলতে পারবে। তবে এইটা খুবই সত্যি যে,ইচ্ছাশক্তি থাকলে বড় কিছু করার সাহস এখান থেকেই পেতে পারো।

নিজের নিয়মিত লেখাপড়া করার পাশাপাশি ম্যাথ অলিম্পিয়াড, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড বা ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা নিয়ে এখন আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীই এম আই টি, হার্ভার্ড, ক্যালটেক, স্ট্যানফোর্ড, ক্যামব্রিজের মতন বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।

আবার এরকম কার্যক্রম করতে করতে সাংগঠনিক কাজে ভালো হওয়ায় কেউ কেউ নিজেরই কোম্পানি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। তোমাদের প্রিয় টেন মিনিট স্কুলও কিন্তু একদল তরুণের এমনই ইচ্ছাশক্তির একটি উদাহরণ।

৫) ইতিবাচক পৃথিবীতে পরিভ্রমণের সুযোগ:

ভালো কাজের সাথে সম্পৃক্ততা তোমাকে পৃথিবীর ইতিবাচকতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। বড় বড় আর গুণী ব্যক্তির সাথে পরিচয়ের সুযোগ এইসব কাজ করতে গেলেই হয়ে থাকে। গঠনমূলক যে কোন কাজে যোগ দিলে প্রতিকূল পরিস্থিতি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোমার চিন্তা-ভাবনা জাগ্রত থাকবে এবং মতপ্রকাশের শক্তি আসবে।

সমাজসেবামূলক কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে দেশের দরিদ্র আর সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য মমতা তৈরি হবে। সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করে এরকম ভালো কাজ যত বেশি করো, তাতে দোষের কিছু নেই!

৬) প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো:

এইটি সহশিক্ষা কার্যক্রমের খুব চমৎকার একটি দিক। স্বাভাবিক জীবনে আমরা খুব সহজে হার মেনে নিতে পারি না বলেই আমার ধারণা। কিন্তু যে কোন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে তুমি হেরে যেতেই পারো। আর এই হার তোমাকে প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে শেখাবে। সুস্থ মানসিকতা বজায় রেখে জেতার জন্য চেষ্টা চালানোর চমৎকার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে তোমার যে কোন সহশিক্ষা কার্যক্রম। একটা মজার ব্যাপার হল, সহশিক্ষা কার্যক্রম করতে করতে পছন্দ-অপছন্দের বহু মানুষের সাথে পরিচয় হবে তোমার।

অপছন্দের মানুষটির পাশে থেকেও স্বাভাবিকভাবে নিজের চলাফেরা যে করা সম্ভব, এই দারুণ কৌশলটা কিন্তু এখানে রপ্ত করা যায়! ভবিষ্যৎ জীবনে যে এটি অনেক কাজে দিবে, সেকথা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়।

৭)অল্টারনেটিভ সোর্স অব হ্যাপিনেস:

এই ধারণাটা নিয়ে ভাবতে আমার নিজের কাছে ভালো লাগে। মানুষের জীবনে কিন্তু কঠিন মুহূর্তের শেষ নেই। পড়াশুনায় হঠাৎ সাফল্য না আসতে পারে, কখনো কখনো পরিবারে কোন একটা ব্যাপারে বনিবনা না-ও হতে পারে। এরকম কঠিন কোন সময়ে এই সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাফল্য বা খ্যাতি তোমার মনে আত্মবিশ্বাস আর প্রেরণা যোগাতে সাহায্য করতে পারে।

একটা ক্রেস্ট বা ট্রফি কিংবা বড় কোন সার্টিফিকেট তোমার অনেক খারাপ কোন মুহূর্তের মধ্যে আনন্দ যোগাতে পারে। এরকম প্রাপ্তি তোমার পরিবারের সদস্যদেরকেও গর্বিত করতে পারে। হয়তো কখনো হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে তুমি লেখাপড়াতেও ভালো করা শুরু করতে পারো। আর দুইদিকেই একসাথে সাফল্য পেয়ে গেলে তো কথাই নেই! তুমি হয়ে যাবে পারফেক্ট অলরাউন্ডার!

এমনটা নয় যে, সহশিক্ষা কার্যক্রম ছাড়া তুমি উপরের কোন গুণ অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ তোমার লক্ষ্য অর্জনে বাড়তি সহায়ক হতে পারে। যে কাজটিই করো না কেন, সেটি করতে হবে মনোযোগ দিয়ে আর প্যাশনের সাথে।

সবশেষে, একটানা লেখাপড়ার একঘেয়েমি দূর করতে এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজ বা সহশিক্ষা কার্যক্রমের জুড়ি নেই। নানারকম কার্যক্রম থেকে যুক্ত হতে পারো নিজের পছন্দের কোন কাজে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, এই কার্যক্রমগুলো নিয়মিত লেখাপড়ার ‘পাশাপাশি’ করতে হবে, লেখাপড়া কে বাদ দিয়ে নয় কিন্তু! লেখাপড়ায় ফাঁকিবাজি একদম করা যাবে না!

Nahian Bin Khaled
Nahian Bin Khaled
Research and Policy Enthusiast

My research interests include political economy, public policy, education, social safety net, and program evaluation.

Related